সুন্দরবনে কচ্ছপের পিঠে স্যাটেলাইট, ছবি যাচ্ছে ইউরোপে!


নিজস্ব প্রতিনিধি

আরটিএনএন

বাগেরহাট: নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়স্থল বাগেরহাটের সুন্দরবন। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো ‘বাটাগুর বাসকা’ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির কচ্ছপ। এ প্রাণীগুলো পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে এখন বংশ বিস্তার করে চলেছে।

এ প্রজনন কেন্দ্রে কচ্ছপের বেড়ে ওঠা, প্রজনন এবং ডিম পাড়ার জন্য ইতোমধ্যেই তৈরি ও খনন করা হয়েছে একাধিক পুকুর, নালা, সেডসহ প্যান (কৃত্রিম পুকুর) ও ডিমপাড়ার স্থান। বর্তমানে এ প্রজনন কেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ১১৭টি ছোট ও ১০টি বড় ‘বাটাগুর বাসকা’ কচ্ছপ আছে।

বন বিভাগের বরাদ্দকৃত ৫০ মি. প্রস্থ ও ১০০ মি. দৈর্ঘ্যের ওপর স্থাপিত বিলুপ্ত প্রজাতির এ কচ্ছপকে রক্ষায় এবং এর প্রজনন, সংরক্ষণ ও সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ বন বিভাগ, জু ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া) টি.এস.এ (আমেরিকা) এবং আই. ইউ. সি. এন (বাংলাদেশ) যৌথ উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো এর গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এরইমধ্যে গবেষণা সফল করতে দুটি বিলুপ্তি প্রজাতির (বাটাগুর বাসকা) কচ্ছপের পিঠে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার, ক্যামেরা বসিয়ে সুন্দরবনে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

বর্তমানে যন্ত্রটি কচ্ছপের জীবনাচরণের তথ্য ও পরিবেশগত ছবি গবেষকদের কাছে সফলভাবে প্রেরণ করছে। করমজলে ওই কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রের ম্যানেজার মো. আ. রব শুক্রবারে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রব বলেন ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি বড় দুটি বাটাগুর বাসকা কচ্ছপের পিঠে স্যাটালাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে ভাটার সময় সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর মোহনায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই স্যাটালাইট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে গবেষকরা বিপন্ন ওই কচ্ছপের জীবনাচরণের তথ্য ও ছবি স্পষ্ট পাচ্ছেন।


রব আরো বলেন ‘বাটাগুর বাসকা বা বড় কঠালি নামের এই কচ্ছপগুলোর সারাবিশ্বে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। খাদ্য হিসাবেও এর রয়েছে পুষ্টিগুণ। খাদ্যাভাব, জেলেদের জালে আটক, খাল ও বিলের পনি দূষণ, নির্বিঘ্নে চলাচলের প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি কারণে এ প্রজাতির কচ্ছপ আজ বিলুপ্তপ্রায়। প্রাপ্ত বয়সে এরা ২৫-৩০ কেজি ওজনের এই কচ্ছপ ৭০-৮০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুর রহমান জানান, বাংলাদেশের বন বিভাগ, আমেরিকার টারটেল সারভাইভাল এলায়েন্স, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা জু ও প্রকৃতি জীবন ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের কুমির ও হরিণের পাশাপাশি ২০১৪ সালে গড়ে তোলা হয় ‘বাটাগুর বাসকা’ কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র। বিশ্বে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায় থাকা ‘বাটাগুর বাসকা’ কচ্ছপ করমজলে প্রজননের আগে বিশ্বের মধ্যে শুধু সুন্দরবনসহ বাংলাদেশ ও ভারতে ছিল মাত্র ১০০টির মতো।

মাত্র ৩ বছরে সুন্দরবনের করমজলে প্রজননের মাধ্যমে এর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১২৭টিতে। বর্তমানে করমজল কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রে ১১৭টি কিশোর-কিশোরী ও ১০টি বড় বাটাগুর বাসক প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বড় পুরুষ ও চারটি নারী কচ্ছপ আছে। বড় অন্য দুটির পিঠে স্যাটালাইট ট্রান্সমিটার বসিয়ে রোববার ভাটার সময় ছেড়ে দেয়া হয়েছে সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগরের মোহনার আদাচাই এলাকার সাগরের পানিতে। এছাড়া আটটি কচ্ছপ চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ডিম দেবে। এরপর ডিম থেকে ফুটে বের হওয়া বাচ্চাগুলো প্রাপ্তবয়স্ক হলে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরে অবমুক্ত করা হবে।


বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ ঢাকা অঞ্চলের বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্কটাপন্ন এই প্রজাতির কচ্ছপ বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে রয়েছে মাত্র ১০০টির মতো। বিলুপ্ত প্রায় এ প্রাণীকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। এ জন্যই মূলত এ আয়োজন কিংবা উদ্যোগ।’

তিনি জানান, বিলুপ্তির পথে থাকা এই প্রজাতির কচ্ছপ রক্ষায় ২০০৮ সালে উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালে করমজলে এ প্রজাতির কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। এ প্রাণীটির স্বভাব, খাদ্য সংগ্রহ, বিচরণ, পরিবেশসহ বঙ্গোপসাগেরর গভীর ও না অগভীর পানিতে থাকতে পছন্দ করে সে সব বিষয়ে জানার জন্য দুটি কচ্ছপের পিঠে স্যাটেলাই ট্রান্সমিটার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘এখন সুদূর অষ্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বসে এ কচ্ছপের জীবনাচরণের তথ্য এবং ছবি স্পষ্ট দেখা যাবে ও মনিটর করা হবে। সুন্দরবনের জেলে-বাওয়ালীদের জালে যদি কখনো এ কচ্ছপ দুইটি আটকা পড়ে তাহলে তারা যেন আমাদের খবর দেয়। তা না হলে তারা যেন দ্রুত জাল থেকে অবমুক্ত করে দেয়। এ জন্য জেলে-বাওয়ালী, র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও নৌ বাহিনীর সহযোগীতা প্রয়োজন। সকলের প্রচেষ্টা ছাড়া কোনোভাবেই এ প্রাণীটিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

স্যাটেলাই ট্রান্সমিটার সিস্টেম সম্পর্কে জাহিদুল কবির জানান ‘মূলত এ প্রাণির স্বভাব, খাদ্য সংগ্রহ, বিচরণ, পরিবেশসহ বঙ্গোপসাগরের গভীর না অগভীর পানিতে থাকতে পছন্দ করে সে বিষয়ে জানার জন্য দুটি কচ্ছপের পিঠে স্যাটেলাই ট্রান্সমিটার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এখন সুদূর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বসে এই কচ্ছপের জীবনাচরণের তথ্য ও ছবি স্পষ্ট দেখা ও মনিটর করা হবে।