পাঠ্যপুস্তকে বিতর্কিত বিষয়, খুশি হেফাজত


নিউজ ডেস্ক

আরটিএনএন

ঢাকা: স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকের কিছু বিষয় প্রণয়নে হেফাজতে ইসলামের পছন্দকে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠছে সেটি নিয়ে বিতর্ক চলছে।

হেফাজতে ইসলামের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, যারা পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে তারা দেশে ‘অস্থিতিশীলতা’ তৈরি করতে চায়।

পাঠ্য-পুস্তক নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে তার দুটো দিক রয়েছে। প্রথমত: বইতে ভুল এবং দ্বিতীয়ত: এমন কিছু ধর্মীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেটি শুধু মুসলমানদের জন্যই প্রযোজ্য।

কয়েকদিন আগে দেশের ৮৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন চলতি বছরের পাঠ্য বইতে তিন ধরনের ভুল, অসংগতি কিংবা বিকৃতি রয়েছে।

তারা বলেছেন, ‘বানান ও তথ্যগত বিকৃতি, বাক্য গঠনে ভুল এবং মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। তথ্য বিকৃতি এবং বাক্য গঠনে ভুলগুলো সঠিক পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় ভুলটি পরিকল্পিত এবং যারা করছেন, তারা ইচ্ছাকৃত ভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য এই কাজটি করে চলছেন’।

২০১৬ সালে হেফাজতে ইসলাম দাবী তুলে ধরেছিল যে, পাঠ্যপুস্তকে স্কুল পাঠ্য-পুস্তকে ইসলামী ভাবধারা বাদ দিয়ে ‘নাস্তিক্যবাদ এবং হিন্দুতত্ব পড়ানো হচ্ছে’।

কিন্তু চলতি বছরে যে পাঠ্য-পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে হেফাজতে ইসলাম পছন্দ করছে বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও তারা সরাসরি সে কথা বলছে না। কিন্তু হেফাজতে ইসলামী নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে সে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

হেফাজতে ইসলামীর মুখপাত্র মাওলানা মুনীর আহমেদ বলেন, ‘এখানে হেফাজতের খুশী-অখুশির প্রশ্ন নেই। বরং দেশের গণ-মানুষের প্রত্যাশার দিকটাই বিবেচ্য বিষয়। পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের দাবী শতভাগ পূরণ করা হয়েছে বলে যারা বিতর্ক তুলতে চাচ্ছে, আমরা মনে করি তাদেরকে সবাই চিনে। তারা সমাজ বিচ্ছিন্ন অতিক্ষুদ্র একটা অংশ’।

গত বছর হেফাজতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যে দাবী উত্থাপন করা হয়েছিল, ‘২০১২ সালে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীর বাংলা বইতে ইসলামী ভাবধারার ১৭টি বিষয় বাদ দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে সাতটি নতুন কবিতা এবং গল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলো ইসলামী ভাবধারা বিপরীত’।

৫ম শ্রেণীতে প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ‘বই’ কবিতা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল সংগঠনটি। হেফাজতে ইসলামীর সে দাবীতে প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে ‘স্বঘোষিত নাস্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করে উল্লেখ করা হয়, ‘বই’ কবিতাটি মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ ‘পবিত্র কোরআন বিরোধী’।

চলতি বছরের পাঠ্য বইতে সে কবিতাটি বাদ দেয়া হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, হেফাজতে ইসলামীর দাবীর কারণেই এটি হয়েছে।

দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ বছরের পাঠ্যপুস্তককে ‘সাম্প্রদায়িক অপরাজনীতির সঙ্গে সরকারের আপসরফার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

৮৫জন বিশিষ্ট ব্যক্তি যে বিবৃতি দিয়েছেন সেখানে স্বাক্ষর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তানজিম উদ্দিন খান। তিনি বলছেন শব্দ ব্যবহার, কবিতা নির্বাচন, লেখা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্ম-কেন্দ্রিক বিষয়কে সামনে আনা হচ্ছে।

তানজিম উদ্দিন খান বলেন, ‘যারা একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করেন, যারা ভিন্ন মতাদর্শের লেখক তাদের লেখা সরিয়ে নেয়া হয়েছে কিংবা অনুপস্থিত। ধর্ম কোনো সমস্যা না। ধর্ম তো মানুষ স্বাভাবিকভাবে চর্চা করবে। কিন্তু ধর্মীয় পরিচিতি ভিত্তিক যে বোধ, সেটাকে যখন গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হয়, তাহলে অন্য দর্মের যারা আছেন তাদের জন্য একটা আশংকা এবং বিপদ তৈরি হয়’।

হেফাজতে ইসলামের চাপে স্কুল পাঠ্য বইতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে চান নি।

সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘পাঠ্য বইয়ের ভুল শোধরানো হবে’। কিন্তু ‘সাম্প্রদায়িক শক্তির’ সাথে আপোষ করার যে অভিযোগ উঠছে সে বিষয়ে মন্ত্রী কিছু বলেননি।

জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন তার বাইরে কিছু বলা ঠিক হবে না’।

সূত্র: বিবিসি